কলকাতা ও রাজ্যজুড়ে নীরব সবুজ হত্যার অভিযোগ
বিজ্ঞাপনের বোর্ডে বিদ্ধ গাছ, সিমেন্টে বাঁধা গোড়া — কলকাতা ও রাজ্যজুড়ে নীরব সবুজ হত্যার অভিযোগ
নিজস্ব সংবাদদাতা, কলকাতা:
কলকাতা শহরসহ রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে প্রকাশ্যে গাছের গায়ে পেরেক ঠুকে পোস্টার ও বিজ্ঞাপন টাঙানো এবং গাছের গোড়া সিমেন্ট বা ইট দিয়ে বেঁধে ফেলার প্রবণতা ক্রমশ বাড়ছে। পরিবেশপ্রেমী ও নাগরিকদের অভিযোগ, এভাবে গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ছে এবং দীর্ঘমেয়াদে গাছের মৃত্যু পর্যন্ত ঘটতে পারে।
শহরের বিভিন্ন এলাকায় দেখা যাচ্ছে, বড় বড় গাছের কাণ্ডে পেরেক পুঁতে কোচিং সেন্টার, আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা, ইভেন্ট বা ধর্মীয় অনুষ্ঠানের বিজ্ঞাপন টাঙানো হয়েছে। কোথাও আবার প্লাস্টিকের তার বা লোহার তার দিয়ে গাছের কাণ্ড শক্ত করে পেঁচিয়ে ব্যানার বাঁধা হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এতে গাছের বাকল ক্ষতিগ্রস্ত হয়, ভেতরের টিস্যুতে সংক্রমণ ছড়াতে পারে এবং গাছ দুর্বল হয়ে পড়ে।
শুধু তাই নয়, বহু জায়গায় ফুটপাত সংস্কার বা সৌন্দর্যায়নের নামে গাছের গোড়া পুরোপুরি সিমেন্ট, কংক্রিট বা ইট দিয়ে ঢেকে দেওয়া হচ্ছে। ফলে মাটির সঙ্গে গাছের শিকড়ের স্বাভাবিক বায়ু ও জল চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। বনবিদ ও পরিবেশকর্মীদের মতে, গাছের গোড়ায় খোলা মাটি না থাকলে বৃষ্টির জল শিকড়ে পৌঁছায় না, মাটির অক্সিজেনের অভাব হয় এবং ধীরে ধীরে গাছের বৃদ্ধি থমকে যায়।
পরিবেশ আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত এক কর্মী বলেন, “একটি পূর্ণবয়স্ক গাছ শহরের তাপমাত্রা কমাতে, দূষণ রোধ করতে এবং অক্সিজেন জোগাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। অথচ সামান্য বিজ্ঞাপনের জন্য গাছকে পেরেক মেরে ক্ষতবিক্ষত করা হচ্ছে। এটা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ হওয়া উচিত।”
উদ্যানপালন বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য, গাছের কাণ্ডে পেরেক ঠোকা মানে মানুষের শরীরে বারবার আঘাত করার মতো। এতে ছত্রাক বা পোকামাকড়ের আক্রমণ সহজ হয়। আবার তার বা দড়ি শক্ত করে বাঁধা থাকলে গাছের কাণ্ড মোটা হওয়ার সময় তা ভেতরে কেটে বসে ‘গার্ডলিং’ প্রক্রিয়া তৈরি করে, যা গাছের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।
আইন কী বলছে? কলকাতা পুরসভা ও বিভিন্ন পৌর সংস্থার নিয়ম অনুযায়ী, সরকারি সম্পত্তি বা রাস্তার ধারের গাছে বিজ্ঞাপন টাঙানো নিষিদ্ধ। তবুও নজরদারির অভাব ও শাস্তির কড়াকড়ি না থাকায় এই প্রবণতা বন্ধ হচ্ছে না বলে অভিযোগ।
নাগরিক মহলের দাবি,
- গাছের গায়ে পেরেক বা তার দিয়ে বিজ্ঞাপন টাঙানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করতে হবে।
- ফুটপাত নির্মাণের সময় গাছের গোড়ায় পর্যাপ্ত খোলা জায়গা রাখতে হবে।
- নিয়ম ভাঙলে জরিমানা ও কড়া ব্যবস্থা নিতে হবে।
- পুরসভা ও প্রশাসনের তরফে সচেতনতা অভিযান চালাতে হবে।
পরিবেশবিদদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তন ও তাপপ্রবাহের সময়ে শহরের প্রতিটি গাছ অমূল্য সম্পদ। তাই উন্নয়ন ও বাণিজ্যের নামে গাছের ক্ষতি নয়, বরং সংরক্ষণই হওয়া উচিত অগ্রাধিকার।
সবুজ রক্ষায় প্রশাসনের দ্রুত পদক্ষেপের অপেক্ষায় এখন সচেতন নাগরিক সমাজ।
Comments
Post a Comment